তিনি এই শহরে এসেছিলেন শূন্য হাতে। পরিশ্রম আর সততা দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল সাম্রাজ্য। আজ শূন্য হাতেই বিদায় নিচ্ছেন এ শহর থেকে। চলে যাচ্ছেন তার নিজ গ্রামে। পারিবারিক কবরস্থানে। যেই গ্রাম থেকে খালি হাতে, বুক পকেটে সংগ্রামী এক স্বপ্ন নিয়ে এই শহরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
আজ আকাশে নেমে এলো গভীর শোকের ছায়া। হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির কারিগর, আমার শ্রদ্ধেয় মামা জনাব শামছুল হুদা এই দুনিয়ার সফর শেষ করেছেন। শৈশব থেকেই মামাকে দেখেছি এক অন্যরকম মানুষ হিসেবে। তিনি ছিলেন শান্ত, পরিশ্রমী, কাজপাগল আর একেবারেই প্রচারবিমুখ। অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অদম্য শক্তি—যেটা তাকে শূন্য থেকে শুরু করে হাজারো মানুষের জীবনের আলো হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই মানুষটা শুরু করেছিলেন একটা টিনশেড দোকান দিয়ে। কোনো পুঁজি ছিল না, কোনো প্রভাবশালী পরিচয়ও ছিল না—ছিল কেবল দুটো জিনিস: নিরলস পরিশ্রম আর দৃঢ় বিশ্বাস। সেখান থেকেই ধাপে ধাপে তিনি দাঁড় করিয়েছেন বিশাল সাম্রাজ্য।
ঢাকার হাতিরপুলের সেই টিনশেড দোকান দিয়ে শুরু করা তার জীবনের সংগ্রাম। দিনের পর দিন সেই দোকানে বসে পরিশ্রম করেছেন। রাত শেষে ভোর হতো, ভোর শেষে দিন—কিন্তু তার শ্রমের ধার কখনো থামেনি। মানুষ হাসত, অবিশ্বাস করত, কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।
সেই টিনশেড দোকানই ছিল এক বীজ, যেখান থেকে জন্ম নিলো বিশাল এক বনানী। ধীরে ধীরে তিনি গড়ে তুললেন বেঙ্গল এজেন্সিস, গ্রেটওয়াল সিরামিক, চারু সিরামিক, এবং একে একে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান। আজ এগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছে। কত পরিবার প্রতিদিন আহার পাচ্ছে, কত স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে—তার হাতের গড়া এই সাম্রাজ্যের কারণে।
আমরা যখন বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নাম শুনি, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে। এগুলোর প্রতিটিই তাঁর হাতের তৈরি স্বপ্ন। একে একে তিনি গড়ে তুলেছেন -গ্রেটওয়াল সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ, চারু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্রেট ওয়াল প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং, গ্রেট ওয়াল প্রিমিয়াম সিরামিক, গ্রেট ওয়াল হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ, সিয়াম বাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ, গ্রেট ওয়াল শিপস এন্ড ডেজার, গ্রেট ওয়াল এ সি ব্লক, গ্রেট ওয়াল স্টিল বিল্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ, বেঙ্গল গ্রানাইট এন্ড মার্বেল ইন্ডাস্ট্রিজ, বেঙ্গল এজেন্সি, আর মানুষের সেবার জন্য আলহাজ্ব শামছুল হুদা জেনারেল হাসপাতাল।
এই সব প্রতিষ্ঠানে কত শত মানুষ কাজ করছেন। তাদের পরিবার বেঁচে আছে, সন্তানরা পড়াশোনা করছে, ভবিষ্যৎ গড়ছে। তাঁর স্বপ্ন আর শ্রমের ফসল আজ দেশের হাজারো পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তি।
শুধু একজন শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন দানশীল, সেবামুখী এক মানুষ। দেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি অনুদান দিয়েছেন। আর সবচেয়ে যে বিষয়টা আমাকে নাড়া দেয়—দেশের কত মসজিদে আজ মানুষ সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, তাদের কপাল ঠেকে যায় উনার দেয়া শীতল টাইলসে। মানুষের সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তে তার পরিশ্রমের ছাপ থেকে যায়—এ যেন অমর দান। মসজিদে মানুষ যখন আল্লাহর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, ভাবতে অবাক লাগে—তার জীবনের দান এতটাই নির্মল যে, ইহকালের পরেও মানুষ সেই দানের ছোঁয়া পাচ্ছে।
আমি যখন মানবজমিনে কাজ করতাম, বহুবার মামাকে বলেছিলাম—“আপনার এই জীবনকাহিনী আমি লিখতে চাই। মানুষ জানুক কিভাবে শূন্য থেকে আপনি একেকটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন।” কিন্তু তিনি কখনো রাজি হননি। বলতেন, “প্রচার নয়, কাজটাই আসল।” এমন মানুষ আজকের দিনে বিরল।
আজ তার প্রতিষ্ঠিত গ্রেটওয়াল সিরামিকে মাসে এক কোটিরও বেশি স্কয়ারফিট টাইলস উৎপাদন হয়। শুধু এই একটি তথ্যই বলে দেয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার অবদান কতটা বিশাল। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আবারও শূন্য হাতে ফিরে যাচ্ছেন—নিজ গ্রামে, পারিবারিক কবরস্থানে।
আমাদের কাছে তিনি কেবল একজন সফল উদ্যোক্তা নন। তিনি ছিলেন সংগ্রামের এক বিরল প্রতীক, পরিশ্রমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণা।
আজ তাকে হারিয়ে অনেক মানুষের বুক ভেঙে যাচ্ছে। তবু তারা সান্ত্বনা খুঁজে এই ভেবে—তিনি রেখে গেছেন এমন অনেক কিছু, যেটা শুধু তার পরিবার নয়, পুরো দেশকে গর্বিত করবে চিরকাল।
আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করি—মহান রাব্বুল আলামিন যেন মামাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।
লেখকঃ বেলায়েত হোসাইন, এখন টেলিভিশন