জহির উদ্দিন বাবরঃ রাষ্ট্র সংস্কারের কথা আজ সর্বত্র। মঞ্চে, মিছিলে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে—সবখানেই শোনা যায় শুদ্ধ রাজনীতি, স্বচ্ছ প্রশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি কখনো ভেবে দেখি—রাষ্ট্র সংস্কারের এই আহ্বানে আমাদের ব্যক্তিগত ভূমিকা কী?
আমাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা একটি সুষ্ঠু, শৃঙ্খলাবদ্ধ, সমঅধিকারসম্পন্ন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন। এই আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করেই সংগঠিত হয়েছিল জুলাই বিপ্লব। জনগণের প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসবে, অনিয়ম কমবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে তেমন সফল হতে পারেনি। বরং অপরাধ ও অনিয়ম আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত হয়েছে, যা নাগরিক আস্থাকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে।
আজ সমাজের প্রায় সব স্তরেই অনিয়মের উপস্থিতি স্পষ্ট। শ্রমিক ও রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—অনেকে কোনো না কোনোভাবে ঘুষ, দুর্নীতি, অবহেলা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত। দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো অনিয়মকে আমরা প্রায়ই তুচ্ছ মনে করি—লাইন ভেঙে সুবিধা নেওয়া, পরিচয়ের জোরে কাজ আদায়, কিংবা সামান্য ঘুষকে ‘বাস্তবতা’ বলে মেনে নেওয়া। এভাবেই অনিয়ম ধীরে ধীরে সামাজিক স্বাভাবিকতায় রূপ নিয়েছে। অথচ এই বাস্তবতার মাঝেই আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ম, নৈতিকতা ও আদর্শ রাষ্ট্রের দাবি জানাই। নিয়মের প্রত্যাশা স্বাভাবিক; কিন্তু আমরা কি কখনো নিজেদের ভূমিকা নিয়ে গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করি? এই অনিয়মের জন্মদাতা কি আমরা নিজেরাই নই?
তাহলে প্রশ্ন আসে—সমাধান কোথায়?
অনেকে মনে করেন, কঠোর আইনই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। আইন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে কেবল আইন দিয়ে সমাজকে শুদ্ধ করা যায় না। কারণ আইন ভয় সৃষ্টি করে, আর নৈতিকতা সৃষ্টি করে বোধ। ভয়ের ওপর দাঁড়ানো শাসন কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না; টেকসই সমাজ গড়ে ওঠে মূল্যবোধ, বিবেক ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে।
পরিবর্তনের সূচনা হওয়া উচিত একেবারে শিকড় থেকে—পরিবার থেকে। পরিবারই মানুষের প্রথম পাঠশালা। সেখানে যদি নিয়ম মানার শিক্ষা দেওয়া হয়, যদি ছোট ছোট অনিয়মকেও অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিকতা বদলাতে সময় লাগবে না। ঘরে মিথ্যা বলা, অন্যায়ভাবে সুবিধা নেওয়া কিংবা নিয়ম ভাঙাকে যদি ‘চালাকির’ নাম দেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্রের কাছে নৈতিকতা প্রত্যাশা করা আত্মবিরোধিতারই শামিল।
পরিবারের পর এই চর্চা ছড়িয়ে দিতে হবে সমাজে। পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অনিয়মের বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু সচেতন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। ধর্ম যদি কেবল আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে, আর নৈতিকতা যদি শুধু স্লোগানেই সীমিত থাকে, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই আসবে না।
রাষ্ট্র বদলাতে হলে আগে মানুষ বদলাতে হবে। আর মানুষ বদলানোর দায়িত্ব কোনো সরকারের একার নয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার। আইন নয়, আত্মশুদ্ধিই হোক রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
লেখকঃ শিক্ষক ও সমাজকর্মী