
মাসুদ আলমঃ হুজুরাতে মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য যে নৈতিক সীমানা টেনে দিয়েছেন, তা যেন নির্বাচনের মৌসুম এলেই ভুলে যাই।
আল্লাহ বলেন—অপরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ বা উপহাস করো না, কাউকে ছোট করে কথা বলো না, নিন্দা করো না, আন্দাজ-অনুমান করে কথা বলো না, মিথ্যা অপবাদ দিও না। আর কোনো খবর গ্রহণ বা প্রচার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করতে বলেছেন—যাতে অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি না হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীছও আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—কাউকে গালি দেওয়া যাবে না, অপবাদ দেওয়া যাবে না, কাউকে প্রহার করা যাবে না।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বহু বছর ধরে রাজনৈতিক পরিসরে এসব কবিরা গুনাহকে যেন সামাজিকভাবে “স্বাভাবিক” বানিয়ে ফেলা হয়েছে। নির্বাচন এলেই মারামারি, গালাগালি, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, অপবাদ, কটূক্তি—সবকিছু যেন গুনাহ পালনের উৎসব হয়ে দাঁড়ায়। নাঊযুবিল্লাহ!
অনেকেই মনে করে—প্রতিপক্ষকে ছোট করতে পারলেই, তাকে অপবাদ দিয়ে খারাপ প্রমাণ করতে পারলেই ভোট বাড়বে। আর এভাবেই গুনাহকে কৌশল বানিয়ে, অন্যের দোষ “আবিষ্কার” করাকেই সফলতা ভাবা হয়।
অথচ একজন মুমিন যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে ভয় করে, আখিরাতকে নিশ্চিত বিশ্বাস করে, তাহলে শুধুমাত্র নিজের দলের ভোট বাড়ানোর জন্য, বা নিজের দলকে মনে প্রাণে ভালোবাসার কারণে বা কোনো নেতাকে খুশি করার জন্য এই হারাম কাজে জড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।
মনে রাখবেন—আপনার প্রার্থী যদি সাহাবীও হতেন, তবুও তাঁর ভোট বাড়ার অজুহাতে বা তাকে সমর্থন করার অজুহাতে আপনি গালি, অপবাদ, মিথ্যা প্রচার, জুলুম বা মারামারিতে লিপ্ত হলে—আপনি নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবেন।
আল্লাহ তায়ালা কোনো পরিস্থিতিতেই এগুলোকে হালাল করেননি। কেউ অপবাদ দিলে শালীনভাবে উত্তর দেওয়া জায়েয, কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং জুলুম—এগুলো কখনো দ্বীনের কাজ হতে পারে না।
এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে এমন এক ভয়ংকর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেনঃ “আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত দেউলিয়া সে ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়েছে, কারো রক্তপাত করেছে, কাউকে প্রহার করেছে।
অতঃপর তার নেক আমল থেকে এদের প্রত্যেককে দেওয়া হবে। যদি তার নেক আমল শেষ হয়ে যায় অথচ পাওনা এখনো বাকি থাকে, তবে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।”
এটাই হচ্ছে আসল দেউলিয়াত্ব—দুনিয়ায় “জয়ী” হয়ে আখিরাতে সর্বস্ব হারানো।
তাই পরিশেষে আমার নিজের এবং আপনাদের সবাইকে বিনীত নসীহত:
আপনি যে দলই করেন না কেন, ইসলামিক বা সাধারণ—আল্লাহ ও রাসূল ﷺ-এর দেওয়া চারিত্রিক আদর্শ ধারণ করুন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনলাইনে বা সরাসরি কখনোই প্রতিপক্ষকে —
✅ ঠাট্টা-বিদ্রূপ করবেন না
✅ উপহাস করবেন না
✅ অপবাদ বা নিন্দা করবেন না
✅ কাউকে ছোট বা তুচ্ছ করবেন না
✅ আন্দাজ-অনুমান করে কথা বলবেন না
✅ কোনো খবর যাচাই ছাড়া শেয়ার করবেন না
✅ গালাগালি করবেন না
✅ মারামারি/প্রহার করবেন না
আর সবচেয়ে বড় সতর্কতা—অনেকেই অজান্তে নিজের ইসলামিক দলকে “দ্বীন” বানিয়ে ফেলেন। তখন সে ভাবে, “আমি তো আল্লাহর জন্যই প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করছি, তাই গালিও দিতে পারি, অপবাদও দিতে পারি।”
কিন্তু মনে রাখবেন—আল্লাহ তাআলা কোনো একটি ইসলামিক রাজনৈতিক দল কে “ধর্মের মর্যাদা” দেননি। তাই সে ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষ আপনার ইসলামিক দলে নেই; শুধু মাত্র এই অজুহাতে হারাম কখনোই হালাল হয়ে যায় না।
অথবা আপনি শুধুমাত্র ইসলামের জন্যই কোনো অরাজনৌতিক ভাবে কোন গ্রুপ করে থাকলে, সে ক্ষেত্রেও ইসলামের কাজ কখনোই হারামের মাধ্যমে হয় না।
আল্লাহ আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন, জবানকে সংযত করুন, ফেইসবুকের ব্যবহারকে হেফাজত করুন, এবং নির্বাচনের ফিতনা থেকে আমাদের ঈমান ও আমলকে রক্ষা করুন—আমিন।
লেখকঃ সিনিয়র ব্যারিস্টার সলিসিটর, ধর্মীয় আলোচক, নিউজিল্যান্ড।